
প্রবাসীদের নিরাপদ রাখতে কুয়েত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চলছে
আবু নাসের মহিউদ্দিন,
কুয়েত প্রতিনিধি,
বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কুয়েতের সরকারি কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে ১১টি সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানের । এর অংশ হিসেবে কুয়েতের প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা জিলিব ও জিলিব আল সুয়েখের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনসমূহ থেকে বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, মিশর, নেপাল ও ফিলিপাইনের প্রবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদকৃতদের জন্য কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে হাসাবিয়ার একটি সরকারি স্কুলে অস্থায়ী শেল্টার হাউজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হঠাৎ করে এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে অনেক কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশি গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর ও চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে এবং শ্রম কল্যাণ উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সেলর শোয়াইব-উল-ইসলাম তরফদারসহ দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল উক্ত শেল্টার হাউজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। প্রতিনিধি দলটি সেখানে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। কুয়েত কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় ওই আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি দলটি ওই এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কুয়েতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
কুয়েতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, কুয়েতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো খালি করে পরবর্তীতে তা অপসারণ করা এবং দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটক করে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। আগামী দিনগুলোতে কুয়েতের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে, কুয়েত কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে তাঁদের শেল্টার হাউজ ত্যাগ করার অনুমতি দিচ্ছে। তবে যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাঁদের ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
অভিযানের ফলে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ও পরিবারসমূহ তাঁদের বৈধ অবস্থানের প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন সাপেক্ষে সাময়িকভাবে এই শেল্টার হাউজে অবস্থান করতে পারবেন, তবে সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে তাঁরা কর্মস্থলে যোগদান বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ করতে পারবেন না। এই চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে কুয়েত প্রবাসী সকল বাংলাদেশি নাগরিককে তাঁদের আবাসনের বৈধতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, বাইরে চলাচলের সময় প্রত্যেককে নিজ নিজ সিভিল আইডি বা অন্য কোনো বৈধ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়েছে।
একজন হাসাবিয়া বসবাস করা প্রবাসী বলেন:-
১৫ জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত কুয়েতের হাসাবিয়া এলাকায় বসবাসকারী অসংখ্য মানুষের জন্য কেটেছে আততঙ্কে, অনিশ্চয়তা ও কষ্টের সময়। এই কয়েক দিনের প্রকৃত যন্ত্রণা শুধু তারাই বুঝতে পারবেন, যারা সরাসরি এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
কার্গো-সংক্রান্ত কাজের কারণে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাকে হাসাবিয়ায় থাকতে হয়েছে। নিজের চোখে দেখেছি অসহায় মানুষের দীর্ঘ সারি, ব্যাগ হাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা পরিবার, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা অসংখ্য প্রবাসী। অনেকেই তাড়াহুড়োয় নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত সঙ্গে নিতে পারেননি।
পর অনেক প্রবাসী এখনো থাকার জন্য রুম বা ফ্ল্যাট পাননি। কেউ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন, কেউ জানেন না কোথায় খাবেন, কোথায় গোসল করবেন, কিংবা কোথায় ফোন চার্জ দেবেন। তীব্র গরমের মধ্যে এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আমরা অতীতে অনেক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজ নিজেরাও অসহায়। কারও কাছে যদি খালি রুম বা ফ্ল্যাটের তথ্য থাকে, অনুগ্রহ করে জানাবেন। এতে অনেক ভুক্তভোগী উপকৃত হবেন।
আমি যা নিজের চোখে দেখেছি, জীবনে কখনো ভুলতে পারব না। মহান আল্লাহ সকল প্রবাসীর কষ্ট সহজ করে দিন, সবাইকে নিরাপদে রাখুন এবং দ্রুত সবার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দিন। আমিন।
আজ রোজ শুক্রবার ১৭ জুলাই ২০২৬।